সুনামগঞ্জ , বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ , ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৪৬৯ পোশাক কারখানা প্রতি মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ডিলারের লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি কার্যালয়ে বীজের মজুত ও বিক্রির অভিযোগ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মওসুমের এক মাস আগেই শুকিয়েছে বীজতলা, বিপাকে হাওরের কৃষক সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি আড়াল করতেই এমপি’র বিরুদ্ধে অপপ্রচার, লুটপাটকারীদের বিচারের দাবি জন্মান্ধ স্বামী, এক চোখে দেখেন স্ত্রী, মানুষের সাহায্যে চলে সংসার শঙ্কা মাথায় নিয়ে বোরো আবাদের প্রস্তুতি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপনে প্রস্তুতি সভা পোশাক কারখানা সচল রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাবা-মা-ভাইবোনসহ ছাত্রলীগ নেতার পুরো পরিবার গ্রেফতার, সঙ্গে ৩ বন্ধুও শীতকালীন সবজি চাষে নেই প্রণোদনা, ভালো দাম, প্রকৃতি ভরসা কৃষকের জাতীয় যুব দিবস পালিত ছাতকে আমন ধান কাটা উৎসব তাহিরপুরে নামমাত্র শিশু পার্ক, দুই বছরেও চালু হয়নি কার্যক্রম জমকালো আয়োজনে পর্দা উঠল গাগলী সুপার লীগ সিজন-৪ এর এইচএসসিতে সুনামগঞ্জের দুই কলেজে পাস করেনি কেউ শাল্লায় দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১ তাহিরপুরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে মানববন্ধন এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়, অর্ধেকই ফেল, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪৬ জন এমপি নূরুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, প্রতিবাদে সোচ্চার বিএনপি নেতাকর্মীরা

মেয়েটিকে অপমান করার আগে নিজের মায়ের মুখটি একবার মনে করুন

  • আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০২:১১:৪১ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ০২:১৩:৫৩ অপরাহ্ন
মেয়েটিকে অপমান করার আগে নিজের মায়ের মুখটি একবার মনে করুন
সীমান্ত তালুকদার সুমন:
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পোশাক পরা এক কিশোরী ক্যামেরার দিকে আঙুল তুলে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিল, "বাজে এঙ্গেল থেকে কেউ ছবি তুলবেন না"। কথাটি হয়তো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু এর মধ্যে যে সাহস ও সচেতনতা রয়েছে, তা আমাদের সমাজের অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও অনুপস্থিত। মেয়েটি বুঝিয়ে দিয়েছে, তার শরীর, তার ছবি এবং তার ব্যক্তিগত মর্যাদার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার নিজেরও রয়েছে। 
অথচ এই আত্মসম্মানবোধের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে বিস্মিত হতে হয়। তার বক্তব্যের উত্তর না দিয়ে শুরু হলো গায়ের রং নিয়ে কটাক্ষ। কেউ বলল, সে কালো, কেউ বলল, তাকে কেউ ফিরেও দেখবে না। এমনকি তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেও কেউ কেউ হাসির প্রতিক্রিয়া জানাল।
একটি মেয়ের আত্মপক্ষ সমর্থনের জবাবে তার চেহারাকে আক্রমণ করার মধ্যে কী ধরনের মানসিকতা কাজ করে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

মেয়েটি তো কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়নি। বরং সে নিজের ছবি নিয়ে অন্যের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের প্রতিবাদ করেছে। অথচ কিছু মানুষ তার প্রতিবাদের জবাবে এমনভাবে কথা বলল, যেন পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় না হলে একজন নারীর নিজের সম্মান রক্ষারও কোনো অধিকার নেই!
এখানেই আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকট প্রকাশ পায়। কিছু মানুষের দৃষ্টিতে নারীর সৌন্দর্য নির্ধারিত হয় পুরুষের পছন্দ দিয়ে, আর তার সামাজিক মূল্যায়ন হয় গায়ের রং দিয়ে। তারা ভুলে যায়, একজন নারীর পৃথিবী কেবল কারও ভালো লাগা কিংবা ভালো না লাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর নিজস্ব পরিচয় আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, মেধা আছে, স্বপ্ন আছে।
এরপর আসে আরও বিব্রতকর বিষয়। মেয়েদের তুলনা করা হচ্ছে মাছ, কাঁটা, বিরিয়ানি কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে! যেন তারা মানুষ নয়, কোনো খাবারের পদ। কাকে পছন্দ হবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে, কাকে গ্রহণ করা হবে এমন এক অদ্ভুত ভোগবাদী মানসিকতার প্রকাশ ঘটছে প্রকাশ্য মন্তব্যে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাক পরা কিশোরীকে নিয়ে এমন উপমা ব্যবহার করার সাহস মানুষ কোথায় পায়? কোনো মেয়েকে অপছন্দ করার অধিকার কারও থাকতেই পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে তাকে অপমান করা কিংবা ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার অধিকার কারও নেই। রসিকতার নাম দিয়ে অশালীনতাকে স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
যাঁরা এসব মন্তব্য করছেন, তাঁদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন?

আপনার জন্ম কোথায়? কোনো এক নারীর গর্ভে। দীর্ঘ দশ মাসের অপেক্ষা, শারীরিক কষ্ট, অসংখ্য ত্যাগ আর প্রসবযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে একজন মা আপনাকে পৃথিবীতে এনেছেন। নিজের শরীরের পুষ্টি দিয়ে আপনাকে বড় করেছেন, অসংখ্য নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন আপনার সুস্থতার জন্য। আপনার প্রথম আশ্রয় ছিল তাঁর কোল, প্রথম নিরাপত্তা ছিল তাঁর বুক, প্রথম পৃথিবী ছিল তাঁর ভালোবাসা।
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আপনার মায়ের গায়ের রং দিয়ে যদি কেউ তাঁর সৌন্দর্য বিচার করত, আপনার কেমন লাগত? তাঁকে যদি কেউ শ্যামবর্ণ কিংবা কালো বলে উপহাস করত, সেটিকে কি আপনি স্বাভাবিক রসিকতা বলে মেনে নিতেন?
মা তো আমাদের কাছে কোনো রঙের পরিচয় নন। তিনি এক অনন্য আশ্রয়, ভালোবাসার অপর নাম, জীবনের সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলোর একটি। তাঁর সৌন্দর্য কোনো প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে নির্ধারিত হয় না। তাঁর মর্যাদা কোনো সামাজিক মাপকাঠির কাছে জিম্মি নয়।
তাহলে অন্যের মেয়েকে ছোট করার সময় সেই একই মানবিক বোধ কোথায় হারিয়ে যায়?
যে মেয়েটিকে আজ আপনারা তুচ্ছ করছেন, সেও কোনো মায়ের সন্তান। তারও একটি পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, ভবিষ্যৎ আছে। আজ সে একজন কিশোরী, আগামী দিনে হয়তো একজন শিক্ষিকা, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। একদিন হয়তো সে নিজেও মা হবে। তার সন্তানের কাছে সে-ই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় ও সুন্দর মানুষ।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার একজন নারীকে সম্মান করার জন্য তাঁকে ভবিষ্যতের মা হিসেবে কল্পনা করতে হবে, এমন নয়। তিনি একজন মানুষ বলেই সম্মানের অধিকারী। মাতৃত্ব নারীর একটি অনন্য পরিচয়, কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব ও মর্যাদা মাতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মানসিকতার পেছনে আমাদের সামাজিক চর্চারও বড় ভূমিকা রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেককে শিখিয়ে দিই, ফর্সা মানেই সুন্দর, কালো মানেই কম আকর্ষণীয়। বিয়ের বিজ্ঞাপনে পাত্রী খোঁজা হয় গায়ের রংয়ের শর্তে। পরিবারে মেয়ের গায়ের রং নিয়ে দুশ্চিন্তা করা হয়। বাজারে ফর্সা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রসাধনী বিক্রি হয়। এমনকি অনেক সময় একটি মেয়ের মেধা, শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের চেয়েও তার বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যে সমাজ প্রতিনিয়ত এমন বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেয়, সেই সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গায়ের রং নিয়ে বিদ্রূপের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এগুলো আমাদের দীর্ঘদিনের ভুল সৌন্দর্যবোধ ও নারীর প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গিরই বহিঃপ্রকাশ।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন অশালীন মন্তব্যের দায় শুধু মন্তব্যকারীর নয়। যারা এসব দেখে আনন্দ পায়, হাসির প্রতিক্রিয়া দেয়, অন্যের অপমানকে বিনোদন মনে করে কিংবা প্রতিবাদ না করে নীরব থাকে, তারাও কোনো না কোনোভাবে এই অসুস্থ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে।
তবে মেয়েটির প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কারণ সে এমন একটি সময়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছে, যখন অনেকেই সামাজিক চাপ কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে থাকে। তার ছোট্ট প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য কাউকে অনুমতির প্রয়োজন নেই।
আসলে ভুলটি মেয়েটির প্রতিবাদে ছিল না, ভুল ছিল সেই মানসিকতায়, যে মানসিকতা একজন নারীর শরীরকে নিজের মন্তব্যের বিষয়বস্তু মনে করে। ক্যামেরার অবস্থান হয়তো কয়েক ডিগ্রি বদলানো যায়, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি দূর করতে প্রয়োজন শিক্ষা, বিবেক ও মানবিকতার পরিবর্তন।
মেয়েটির গায়ের রং কালো হতে পারে, শ্যামবর্ণ হতে পারে কিংবা ফর্সা হতে পারে। তাতে তার সম্মান, যোগ্যতা কিংবা মানুষ হিসেবে তার মূল্য একটুও কমে না। সৌন্দর্যের কোনো একক রং নেই। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বও মুখের আদলে নির্ধারিত হয় না।
একটি কথা মনে রাখবেন যে মায়ের গর্ভে আপনার জন্ম, সেই নারীও একসময় কারও আদরের মেয়ে ছিলেন। তাঁরও ছিল নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার, স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা এবং সম্মান নিয়ে পৃথিবীতে চলার আকাঙ্ক্ষা।
নিজের মায়ের জন্য যে সম্মান প্রত্যাশা করেন, অন্যের মেয়ের জন্যও সেই সম্মানটুকু বজায় রাখুন। কারণ নারীর সম্মান কোনো বিশেষ রং, সম্পর্ক কিংবা পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়।
সমাজকে আরও সুন্দর করতে হলে আগে আমাদের চোখের দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দর করতে হবে। একজন নারীকে দেখার আগে তাঁকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে।

মনে রাখবেন, একজন নারী কারও পছন্দের বস্তু নন, তিনি নিজের স্বপ্ন, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
প্রতি মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ

প্রতি মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ১০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ